“প্রজন্মের দায়িত্ববোধে শহিদবুদ্ধিজীবী এবং দেশপ্রেম”

Estimated read time 1 min read

ডিসেম্বর,১৬,২০২৩

“নাজনীন নাহার”

হে আমার সমসাময়িক প্রজন্ম এবং হে আমাদের নতুন প্রজন্ম। আপনারা, তোমরা ক’জন জানেন আমাদের শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. ফজলে রাব্বিকে?
কজন জানেন সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, কবি মেহেরুন্নেসা সহ সকল দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের?
কতটুকুইবা জানেন বাংলার এই সকল স্বর্ণ সন্তানের কথা?
তাদের অনন্য অসাধারণ মেধা ও মননের কথা? কতখানি জানেন মানবিক গুণ ও মানবতার জন্য তাদের অনন্য অবদানের কথা?
যারা জানেন তারাইবা কতটুকু জানেন এবং সেই জানা থেকে কতটুকু জানিয়েছেন আপনার সমসাময়িক প্রজন্মকে?
আপনার সন্তানকে?
আগামীর প্রজন্মের কাছে কতটুকু পৌঁছে দিয়েছেন আপনার জানার অংশভাগ?
কে কে বিস্তারিত জানেন স্বাধীনতা যুদ্ধে এই মহান মানুষের মানবিক সকল কর্ম ও অবদানের কথা?

আজ এত প্রশ্ন কেন?
কারণ এই প্রশ্নগুলো আমি প্রায়ই আমাকে করি। আজ থেকে আপনাদের সকলকে প্রশ্নগুলো করব। কতটুকু দায়িত্ব পালন করেছি আমরা প্রত্যেকে স্বাধীনতা পরবর্তী এই দীর্ঘ বায়ান্ন বছর?
সব দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। নয় কেবল রাজনৈতিক নেতাদের। দেশ আপনার আমার আমাদের। তাই দায়িত্ব কিছু কিছু করে আমাদেরও। দেশকে ভালোবেসে কেবল নিজের ও নিজের পরিবার পরিজনের আখের গোছানো নয়। দেশকে ভালোবেসে দেশের জন্য নিজের জায়গা থেকে কিছু না কিছু করতে পারার নিঃস্বার্থ ইচ্ছে, চিন্তা ও চেষ্টাকেই দেশপ্রেম বলে।

দীর্ঘ বায়ান্ন বছরে স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশ, বাতাস, মাটি ও ক্ষমতার সুফল থেকে আমরা সকল প্রজন্ম কেবল আমাদের ব্যক্তিগত ঝোলা ভরেছি। অবশ্য নথিপত্র বলে দেশের উন্নতি করেছেন সরকার প্রধানরা এবং রাজনৈতিক নেতারা। নথিপত্র অবশ্য আরও অনেক কিছুই বলে ক্ষমতা, রাজনীতি, রাজনৈতিক নেতাদের কৃতকর্মের বিষয়ে! সেদিকে না যাই। আমরা আমাদের কৃতকর্ম দেখি।

যদিও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যাবস্থায় একাত্তরের বীরগাঁথা কিছু গল্প উপস্থাপন করে প্রশাসন সেই গল্পকে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দিয়ে মুখস্থ করিয়েছেন। মুখস্থ করিয়েছেন কেবল পরীক্ষা পাশের নিমিত্তে। আমাদের প্রজন্মের কাঁধে দায়িত্ব পালনের দায়দায়িত্ব দেওয়া হয়নি সেভাবে। মিছিল, মিটিং, হানাহানি, মারামারি আর দলবাজিতে তরুণ প্রজন্মকে এত বেশি ডুবিয়ে রাখা হয়েছে যে। বিশেষ দিবস পালনে বিশেষ কিছু স্লোগানেই কেবল মেতেছি আমরা। কিন্তু উপলব্ধি করতে শিখিনি দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও এর বিশালতাকে। চিনিনি ঠিকঠাক শহিদবুদ্ধিজীবীদের নামধাম এবং তাদের সুকর্ম ও মৃত্যুর ইতিহাস। লজ্জা বলে লুকিয়ে রেখেছি একাত্তরের আত্মত্যাগী বীরাঙ্গনা মা বোনদের জীবনের ইতিবৃত্ত।

তাইতো আজকের প্রজন্ম শহিদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস এবং মহান বিজয় দিবস ঠিকঠাক চিনে না, বোঝে না, উপলব্ধি করে না। বরং একেবারেই গুলিয়ে ফেলে সব। যেই বাংলাদেশে এখন হাজার হাজার সচল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেই দেশে বর্তমানে শিক্ষার হার বেড়েছে যথেষ্ট। যেই দেশের শিক্ষা কারিকুলামে কত কত এক্সপেরিমেন্ট করা হচ্ছে নিয়মিত। সেই দেশ আমাদের বাংলাদেশের অধিকাংশরাই স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পরিষ্কারভাবে জানছে না। ঠিকঠাক জানছে না আমাদের সন্তানরা। বুঝতে শিখছে না কত বড়ো দায়িত্ব তাদের কাঁধে। উপলব্ধি করছে না দেশপ্রেমের মহান ব্রতের বিশুদ্ধতা।সকলেই প্রায় ভুলতে বসেছি আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাসের সঠিক ইতিবৃত্ত। ভুলে গেছি মহান শহিদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ এবং তাদের সাথে ঘটে যাওয়া নিঃসংশয়তা। ভুলে গেছি বীরাঙ্গনা মা বোনদের আত্মত্যাগ। ঠিকঠাক জানি না, চিনি না আমাদের সকল মহান শহিদবুদ্ধিজীবীদের বিষয়ে।

যে জাতি তার প্রকৃত ইতিহাস ভুলে যায়। যে দেশের চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টেশন, সাহিত্য ও সংষ্কৃতিতে সত্যিকারের ইতিহাস লিপিবদ্ধ থাকে না। ক্ষমতার হাত বদলে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ভাবে বদল হতে থাকে ইতিহাসের নকশাপত্র। ইতিহাস বিকৃতির জাগতিক বাস্তবতায় যে জাতির প্রজন্ম ভুলে যায় দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পেছনের আত্মত্যাগের ইতিকথা। সেই জাতি যতই উন্নয়নের জোয়ারে ভাসুক। তারা কখনোই সমৃদ্ধ জাতি হতে পারে না। যা খুবই দুঃখ জনক সত্য বাঙালি জাতির জন্য।

আমাদের কাছে শহিদ বুদ্ধিজীবীরা এখন কেবল ১৪ই ডিসেম্বরের স্মরণসভা। শিশু-কিশোরদের মস্তিষ্কে কপি পেস্ট এর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগীতা। দেশ নেতাদের ও সংষ্কৃতি কর্মীদের কিছু কালো পোশাক বা কালো ব্যাচের বাহারি শোকপালন, প্রিন্ট মিডিয়ায় গৎবাঁধা কপি-পেস্টের তথ্যচিত্র, অগুনতি টিভি চ্যানেল ও অনলাইন লাইভে গতানুগতিক ধারার টাইম পাস টাইপ টকশো। রাত বারোটা থেকে পরবর্তী রাত বারোটা অব্দি চব্বিশ ঘণ্টার একখানা স্মরণসভা ও মাল্যদানের সীমাবদ্ধতা।

আচ্ছা একবারও আপনাদের মস্তিষ্ক ও মননে প্রশ্ন জাগে না হে মহান মহীয়সী গুণী ব্যক্তিবর্গ!
অদ্যাবধি কী উপকার হয়েছে এই ছকবাঁধা আয়োজনে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অগুনতি টাকা খরচ করে?
আপনাদের এইসকল তথাকথিত কীর্তি কর্ম দেখলে ডা. ফজলে রাব্বিরা লজ্জায় মূর্ছা যেতেন। ভাগ্যিস শহিদবুদ্ধিজীবীরা স্বপ্ন বুকে নিয়েই শহিদ হয়েছেন। নয়তো আজ আমাদের ইতিহাস বিকৃতি এবং ইতিহাস ভুলে যাওয়া দেখে তাদের যে আত্মদহন হতো। স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের ক্রিয়াকর্মে তাদের যে লজ্জা হতো। তার হিসেব আজ কে দিতো!

শুনেছি আজকাল নাকি টিকটক আর রিলস এর যুগ। তাই প্রজন্ম তাদের সময় ও মনোযোগ ক্ষয় করে বাড়তি কোনো লেখা ও ইতিহাস পড়তে চায় না। লম্বা সময় নিয়ে কোনো ডকুমেন্টারি দেখার ধৈর্য কারও নেই। যত অল্প সময়ে সর্টকার্ট অনেক কিছু বোঝানো যায় বা দ্রুত সময়ে মনোরঞ্জন করা যায় ততই দর্শক ও শ্রোতা বেশি থাকে তাতে।

আচ্ছা তাকেই চলুন কাজে লাগাই। শহিদবুদ্ধিজীবীদের জীবনের, আত্মত্যাগের এবং শহিদ হওয়ার খণ্ডচিত্র তৈরি করতে উদ্ধুদ্ধ করুন তরুণদেরকে। তাদের পাঠবইয়ের পাতায় গুঁজে দিন স্বাধীনতা যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। মুখস্থ করে পরীক্ষা পাশ আর নয়। তাদের অস্তিত্বে বুনে দিন দেশের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য। দীর্ঘ বায়ান্ন বছর তো বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছি আমরা সকলে। চলুন আগামীর পঞ্চাশটি বছর একটা মাত্র দলকে শক্তিশালী করি। সেই দল হবে প্রকৃত দেশপ্রেমিকের দল।
এবার পঞ্চাশটা বছর দিন শহিদমুক্তিযোদ্ধা ,
Naznin Nahar
শহিদবুদ্ধিজীবী এবং শহিদ ও বেঁচে থাকা বীরাঙ্গনা মা বোনদের প্রতি শ্রদ্ধায়, সম্মানে সঠিক দেশপ্রেমিক হতে উদ্ধুদ্ধ করতে। প্রজন্মকে দায়িত্ববান করুন। দেখবেন দেশের অর্থ পাচারে ডুবে থাকবে না আপনার আমার সন্তান ও প্রজন্ম। দেখবেন সকলে আবার এক একজন মহান দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা হবে। হবে এক একজন সাহসী বীর ড. ফজলে রাব্বি, শহিদুল্লাহ কায়সার, ড. মুনির চৌধুরী, জহির রায়হান, সেলিনা পারভীন, কবি মেহেরুন্নেসা সহ সকল দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী।

এই দায়িত্ব আপনার আমার আমাদের সকলের দায়িত্ব। তাই নিজ নিজ জায়গা থেকে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধােদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস, বীরাঙ্গনাদের দহনের ইতিহাস, বাংলার সমৃদ্ধ সম্পদ শহিদ বুদ্ধিজীবীদের নির্মম গণহত্যার ইতিহাস জানি এবং সকল প্রজন্মকে জানাই।
কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় নয়। আসুন নিজ নিজ কর্মে ও বিশ্বাসে আমরা আমাদের দেশাত্মবোধের দায়িত্ব নেই। আমাদের সন্তান ও প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করি স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস জানতে, মানতে, উপলব্ধি করতে, ধারণ ও যাপন করতে। এবং কেবলমাত্র উপলব্ধিতে থেমে থাকলেও চলবে না। দীর্ঘ বায়ান্ন বছর আমরা কাটিয়েছি উপলব্ধি করতে করতে। আমি চাই দায়িত্ব দিতে এবং দায়িত্ব নিতে। অন্যের ঘাড়ে দায়িত্বের দায় রেখে নয়। নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজের কাজে, চেতনায়, বিশ্বাসে ও কর্মে কার্যকর প্রয়োগ ঘটাতে হবে। এই পঞ্চাশ বছর কেবল চেতনা মুখস্থ পড়েছি আর ভুলেছি।
এবার আমি দায়িত্ব নিতে চাই ও দিতে চাই জাতীয় বিবেককে, চেতনাকে।
প্রজন্মকে।
শুধু কথায় নয়,
শুধু পরীক্ষা পাশে নয়,
বিসিএসে টেকার জন্য নয়।
নেতা হওয়ার জন্য নয়।
আত্মউপলব্ধি করা এবং প্রত্যেককে নিজে জানা ও সকলকে জানানো।
নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজেকে সমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়া। দেশাত্মবোধে জাগ্রত হওয়া। নিজের কাজগুলো ঠিকঠাক করা।
লেখাপড়ায় ফাঁকি না দিয়ে ঠিকমতো লেখাপড়া করাও কিন্তু দেশপ্রেম।
সত্যিকারের মানুষ হওয়াও দেশপ্রেম।
মনুষ্যত্ব বোধও দেশপ্রেম।
অপরের অধিকার খর্ব না করাটাই দেশপ্রেম।
এরকম কিছু চাওয়া ও চাওয়ার প্রয়োগ চাচ্ছি আমি। চাচ্ছি একটিমাত্র দিন ১৪ই ডিসেম্বরকে স্মরণ করে কেবলমাত্র দিবস পালনের নিয়মিত নিয়মে সীমাবদ্ধ না থেকে আমরা সকলে আমাদের বাংলাদেশের সম্পদ দেশবরেণ্য শহিদবুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগের মাহাত্ম্য ধারণ করে প্রকৃত দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হই। হই প্রকৃত অর্থে মানুষ এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক।

www.bbcsangbad24.com

আরও দেখুন আমাদের সাথে......

More From Author